Image

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, শ্রীমঙ্গল – Lawachara National Park, Sreemangal

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশে অসংখ্য বনাঞ্চল রয়েছে, যার মধ্যে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান অন্যতম। এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সংরক্ষিত বন, যা জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এবং পরিবেশগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত এই উদ্যানটি প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য আকর্ষণ।

অবস্থান ও ইতিহাসঃ

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এটি ১৯৯৬ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বৃটিশ আমলে এই বনটি মূলত রেললাইনের কাঠের জোগান দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হতো, তবে পরবর্তী সময়ে এটি সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

জীববৈচিত্র্যঃ

জীব বৈচিত্র্য মূলত এ বনের প্রধান আকর্ষণ। জীব বৈচিত্র্যের ভরপুর এই উদ্যানে দেখা মেলে নানা প্রজাতির বিড়ল পশুপাখির। জাতীয় তথ্যকোষের হিসেবে এই উদ্যানে ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। বাংলাদেশের একমাত্র জীবিত আফ্রিকান টিকওক গাছটি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে আছে। পৃথিবীর মাত্র চারটি দেশে বিলুপ্তপ্রায় উল্লুক পাওয়া যায় এবং বাংলাদেশের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানেই সবচেয়ে বেশী সংখ্যায় এই উল্লুক দেখা যায়।

তারমধ্যে চাপালিশ, সেগুন, আগর, জারুল, আকাশমনি, লোহাকাঠ, আওয়াল সহ ১৬০ প্রজাতির উদ্ভিদ। ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২৪০ প্রজাতির পাখি, ৬ প্রজাতির সরীসৃপ রয়েছে। উল্লেখযোগ্য বন্যপ্রাণীর মধ্যে হরিণ, লজ্জাবতী বানর, মুখপোড়া হনুমান, বনরুই গন্ধগোকুল, বাগডাশ, বনমোরগ, সজারু, অজগর সাপ, গুইসাপ, হনুমান, শেয়াল, মেছোবাঘ, চিতাবিড়াল, বনবিড়াল, কাঠবিড়ালী, বন্যকুকুর উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও রয়েছে পাহাড়ি ময়না, ধনেশ, মথুরা, সবুজ ঘুঘুসহ বিচিত্র নানান ধরনের পাখি।

লাউয়াছড়া ভ্রমনঃ

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভিতর রয়েছে এক, দেড় ও তিন ঘন্টার তিনটি ট্রেইল, যেখানে পর্যটকরা প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে উপভোগ করতে পারে। তিনটি পথের মধ্যে একটি ৩ ঘণ্টার পথ, একটি ১ ঘণ্টার পথ আর অপরটি ৩০ মিনিটের পথ। প্রশিক্ষিত গাইডের সহায়তায় বনের একেবারে ভেতর পর্যন্ত যাওয়া যায়। প্রকৃতিকে বিরক্ত না করে তৈরি করা এ তিনটি পথে চোখে পড়বে নানা প্রজাতির কীটপতঙ্গ, গাছপালা, পাখি ও অর্কিড। ভাগ্য ভালো হলে হনুমান, বানর এবং উল্লুকেরও দেখা মিলতে পারে। দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক প্রতিদিন লাউয়াছড়ায় প্রকৃতি ভ্রমণে আসেন। বছরজুড়েই এই বনে পর্যটকদের আনাগোনা থাকলেও শীতের সময় সবচেয়ে বেশি লোকসমাগম হয়।

🔹 আধ ঘণ্টার ট্রেকিং: এ পথটির শুরু রেললাইন পেরিয়ে হাতের বাঁ দিক থেকে। এ পথের শুরুতে উঁচু উঁচু গাছগুলোতে দেখা মিলতে পারে কুলু বানরের। নানা রকম গাছ-গাছালির ভেতর দিয়ে তৈরি করা এ হাঁটা পথটিতে চলতে চলতে জঙ্গলের নির্জনতায় শিহরিত হবেন যে কেউ। এ ছাড়া এ পথের বড় বড় গাছের ডালে দেখা মিলবে বুনো অর্কিড। যদিও এ সময়টা অর্কিডে ফুল ফোটার সময় নয়। নির্দেশিত পথে হাতের বাঁয়ে বাঁয়ে চলতে চলতে এই ট্রেইলটির শেষ হবে ঠিক শুরুর স্থানেই।

🔹 এক ঘণ্টার ট্রেকিং: এক ঘণ্টার ট্রেকিংয়ের শুরুতেই দেখবেন বিশাল গন্ধরুই গাছ। এ গাছের আরেক নাম কস্তুরী। এগাছ থেকে নাকি সুগন্ধি তৈরি হয়। এ ছাড়া এ পথে দেখবেন ঝাওয়া, জগডুমুর, মুলী বাঁশ, কাঠালি চাঁপা, লেহা প্রভৃতি গাছ। আরো আছে প্রায় শতবর্ষী চাপলিশ আর গামারি গাছ। এ ছাড়া এ পথে নানারকম ডুমুর গাছের ফল খেতে আসে উলস্নুক, বানর, হনুমান ছাড়াও এ বনের বাসিন্দা আরো অনেক বন্যপ্রাণী। ভাগ্য সহায় হলে সামনেও পড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া এ পথে দেখা মিলতে পারে মায়া হরিণ আর বন মোরগের।

🔹 তিন ঘণ্টার ট্রেকিং: তিন ঘণ্টার হাঁটা পথটিও বেশ রোমাঞ্চকর। এ পথের বাঁয়ে খাসিয়াদের বসত মাগুরছড়া পুঞ্জি। এ পুঞ্জির বাসিন্দারা মূলত পান চাষ করে থাকেন। ১৯৫০ সালের দিকে বনবিভাগ এ পুঞ্জি তৈরি করে। এ পথে দেখা মিলবে বিশাল বাঁশবাগান। এ বাগানে আছে কুলু বানর আর বিরল প্রজাতির লজ্জাবতী বানর। লজ্জাবতী বানর নিশাচর প্রাণী। এরা দিনের বেলায় বাঁশের ঝারে ঘুমিয়ে কাটায়। এ ছাড়া এ পথে দেখা মিলবে নানান প্রজাতির পাখির, আর পথের শেষের দিকে দেখা মিলতে পারে এ বনের অন্যতম আকর্ষণ উলস্নুক পরিবারের। এরা বনের সবচেয়ে উঁচু গাছগুলোতে দলবদ্ধভাবে বাস করে।

যাতায়াত ব্যবস্থাঃ

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন যানবাহনের ব্যবস্থা রয়েছে।
🔹 সড়কপথ: ঢাকা থেকে বাসে শ্রীমঙ্গল বা মৌলভীবাজারে গিয়ে স্থানীয় যানবাহনে উদ্যান পর্যন্ত পৌঁছানো যায়।
🔹 রেলপথ: ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন সার্ভিস রয়েছে। সেখান থেকে রিকশা বা সিএনজিযোগে উদ্যান পর্যন্ত পৌঁছানো যায়।

উদ্যানে ভ্রমণের সময় সতর্কতাঃ

🔹 বনের যেখানে সেখানে ময়লা ফেলবেন না এতে বনের জীব বৈচিত্রের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।
🔹 খুব বেশি হৈ চৈ করবেন না এতে বন্য প্রানীদের স্বাভাবিক চলাফেরা ব্যহত হয়।
🔹 শীতকাল ছাড়া অন্য সময়ে ভ্রমণের ক্ষেত্রে জোঁক ও সাপের থেকে সতর্ক থাকুন।
🔹 অপরিচিত কারো সাথে একা একা বনের গভীরে যাবেন না এতে আপনি ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারেন।
🔹 রেললাইন ধরে হাটার সময় ট্রেনের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।
🔹 কম খরচে ভ্রমণ করতে চাইলে রিজার্ভ গাড়ি না করে শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ রোডের লোকাল সিএনজি অথবা বাস দিয়ে যাতায়াত করতে পারেন।

← New Article
শ্রীমঙ্গল চা বাগান – Sreemangal Tea Garden

শ্রীমঙ্গল চা বাগান – Sreemangal Tea Garden

Old Article →
মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, শ্রীমঙ্গল – Madhabkunda Waterfall, Sreemangal

মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, শ্রীমঙ্গল – Madhabkunda Waterfall, Sreemangal